মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা) ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের রিভিউ খারিজ করে মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
এর ফলে এই দুই যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকরে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না। তবে নিয়ম অনুযায়ী তারা এখন কেবল নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। এ বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে সরকার দণ্ড কার্যকর করবে।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় সালাউদ্দিন কাদের ও মুজাহিদের এ রায় ঘোষণা করা হয়। এটি তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার চূড়ান্ত আদেশ।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চে বুধবার সকালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রিভিউ আবেদনের শুনানি হয়। এর আগে মঙ্গলবার একই বেঞ্চে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রিভিউ শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য এ সময় নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে সালাউদ্দিন কাদের ও মুজাহিদের রিভিউয়ের জন্য ২ নভেম্বর দিন ধার্য ছিল। ওই দিন শুনানি শেষে নতুন করে ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য করেন আপিল বিভাগ।
চলতি বছরের ১৬ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আলবদর বাহিনীর প্রধান ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেন সুপ্রীম কোর্ট।
আর ২৯ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
মুজাহিদের বিচার
মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আলবদর কমান্ডার আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বছর ১৬ জুন আপিল বিভাগ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে।
পরে এ বছরের ২৯ জুলাই তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করে আপিল বিভাগ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ এই যুদ্ধাপরাধীর মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করার পর ১৪ অক্টোবর রায় পূনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় মুজাহিদকে। এরপর ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। একাত্তরের সুরকার আলতাফ মাহমুদ, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমি ও বদী আজাদসহ কয়েকজনকে হত্যায় নির্দেশসহ ৬ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭ টি অভিযোগ সুনির্দিষ্ট করা হয় মুজাহিদের বিরুদ্ধে।
সাকার বিচার
২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-১। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে
কবীর, বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।
এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আপিল করেন বিএনপির এ নেতা। তবে সর্বোচ্চ সাজার প্রেক্ষিতে আপিল করেননি রাষ্ট্রপক্ষ।
২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার হন সাকা চৌধুরী। পরে একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
গত ১৬ জুন শুরু হয়ে ১৩ কার্যদিবসে আপিল শুনানি শেষ হয় গত ৭ জুলাই। ২৯ জুলাই সাকা চৌধুরীর ফাঁসির চূড়ান্ত রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত।
এ রায়ে ট্রাইব্যুনাল সাকা চৌধুরীকে অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যাসহ যে চার হত্যা-গণহত্যার দায়ে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছিলেন সেগুলোর সাজাই বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত।
ফলে চূড়ান্ত রায়েও অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা (৩ নম্বর অভিযোগ), রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে তিন জনকে গণহত্যা (৫ নম্বর অভিযোগ), রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় ৫০-৫৫ জনকে গণহত্যা (৬ নম্বর অভিযোগ) এবং চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে হত্যার (৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে ফাঁসির আদেশ হয়েছে তার।
এদিকে, ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত ৯টি অভিযোগের মধ্যে অন্য তিনটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে ২০ বছর এবং আরো দুইটি অভিযোগের প্রতিটিতে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল তাকে। সব মিলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি মোট ৭০ বছরের কারাদণ্ড পান তিনি।
এর মধ্যে শুধু রাউজানের সতীশ চন্দ্র পালিতকে হত্যার (৭ নম্বর অভিযোগ) দায় থেকে আপিল বিভাগের রায়ে খালাস পেয়েছেন তিনি, যে অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এর ফলে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি মোট ৫০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রয়েছে।
বহাল থাকা অন্য চার অভিযোগের দণ্ডাদেশের মধ্যে রাউজানের গহিরা গ্রামের হিন্দুপাড়ায় গণহত্যা (২ নম্বর অভিযোগ) ও জগৎমল্লপাড়ায় ৩২ জনকে গণহত্যার (৪ নম্বর অভিযোগ) দায়ে ২০ বছর করে ৪০ বছর এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে নির্যাতন (১৭ নম্বর অভিযোগ) এবং চান্দগাঁওয়ের সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করে সাকা চৌধুরীর পারিবারিক বাসভবন গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতনের (১৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে ৫ বছর করে আরো ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে সাকাকে।
ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ১৭টির পক্ষে সাক্ষী হাজির করেন রাষ্ট্রপক্ষ। সেগুলোর মধ্যে দোষী সাব্যস্ত করা ৯টি বাদে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়া বাকি ৮টি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।
এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ যে ৬টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করেননি সেগুলো থেকেও সাকা চৌধুরীকে খালাস দেওয়া হয়। এ ১৪টি অভিযোগের বিষয়েও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।