শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৮৭তম জন্ম বার্ষিকী আজ

ekattorer-dinguli-2

তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দেয়ার বীর নারী, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির জন্য দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রসবিনী জাহানারা ইমাম তাঁর হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আরেকটি যুদ্ধ

জাহানারা ইমাম একজন বাংলাদেশী লেখিকা, শহীদ জননী, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন

আজ মে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৮৭তম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকএকাত্তরের দিনগুলি রচয়িতার জন্ম ১৯২৯ সালের মে অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে

তার পারিবারিক নাম জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ু। তিনি ১৯৪২ সালে এসএসসি, ৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। এরপর ১৯৬০

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন

সাত ভাইবোনের মধ্যে জাহানারা ইমাম ছিলেন সবার বড়। বাবার কাছে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। শিশুকাল থেকে দশ থেকে বারো বছর বয়স পর্যন্ত জাহানারার সময় কেটেছে কুড়িগ্রামে। বাবার চাকরির (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) কারণে কখনো সেতাবগঞ্জ, কখনো ঠাকুরগাঁ, কখনো খেপুপাড়া বসবাস করতে হয়েছে তাকে

জাহানারা ইমামের কর্মজীবন কেটেছে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করে। ১৯৯১ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ছাড়াও তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার

একাত্তরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং পরবর্তীতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন। রুমীর শহীদ হওয়ার সূত্রেই তিনিশহীদ জননী মযার্দায় ভূষিত হন

কী দুর্ভাগ্য জননীর ! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বামী শরীফ ইমামও মারা যান।৭১ সালে স্বামী আর সন্তান হারানো জননী স্বাধীনতা উত্তর এদেশের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক

তবে তিনি শহীদ জননী হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেন নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্টএকাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিগঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিককৃষকনারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটিগঠনে তিনিই মূল ভূমিকা রাখেন

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণ সমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহা সমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ স্বাধীনতা দিসবে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ তদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণ তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণ তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন

সময় খুব দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি মারা যান

মরণব্যাধি দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে জাহানারা ইমাম ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন

অসুস্থ্য শরীর নিয়েই দীর্ঘদিন একাত্তরের ঘাতক, যুদ্ধাপরাধীসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরোদ্ধে লড়াই করেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। জীবনের শেষমুহূর্তেও তিনি তাঁর দায়িত্বের কথা ভুলে যান নি। মৃত্যুর আগে কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি লিখে গেছেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার শেষ চিঠি, ‘আমি না থাকলেও আপনারা আমার সন্তানসন্ততিরাআপনাদের উত্তরসূরিরা সোনার বাংলায় থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *