সামনে ঈদ। তাই নতুন কাপড় পাওয়ার আশায় ভিড় জমিয়েছিলেন ওরা। কিন্তু নিয়তি ওদের নতুন কাপড় দিয়েছে ঠিকই তবে তা জীবিত মানুষের পরার জন্য নয় মৃতের কাফন। প্রহরীর লাঠিপেটায় এবং হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন ২৬ জন। নতুন কাপড় জীবিত মানুষের পরার জন্য নয় নিজেরা লাশ হয়ে কাফনে মুড়ে বাড়ি ফিরেছেন ওরা। আহত হয়ে হাসাপাতালে কাতরাচ্ছেন আরো কয়েকেজন।
প্রতি বছরের মতো এবারো জাকাতের কাপড় বিতরণের উদ্যোগ নেন ময়মনসিংহ শহরের অমৃত বাবু রোড এলাকার বাসিন্দা নূরানী জর্দ্দা ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী শামীম তালুকদার। শহরের বিহারি ক্যাম্প, দুলদুল ক্যাম্প ও থানাঘাট বস্তিসহ শহরের বস্তি এলাকায় হতদরিদ্রদের মধ্যে ৬শ কার্ড বিতরণের মাধ্যমে শুক্রবার সকাল থেকে জাকাতের ওই শাড়ি–লুঙ্গি বিতরণের দিন ধার্য করেন। এই কাপড় নেয়ার জন্য সেহেরি খাওয়ার পর থেকেই আসতে থাকে মানুষ।
আনুমানিক তিন হাজার মানুষের ভিড় জমে যায় ভোর ৪টা বাজতে না বাজতেই। অপেক্ষা করতে থাকেন ময়মনসিংহ পৌর এলাকার নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরির মালিকের বাড়ির সামনেসহ আশপাশের অলিগলিতে। ভোর পৌনে ৫টার দিকে কাপড়ের জন্য গেটের ভেতর প্রবেশ করতে চাইলে ফ্যাক্টরির কর্মচারীরা তাদের বাধা দেন এবং ভেতর থেকে লাঠিপেটা করেন। এ সময় হুড়োহুড়ি করে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রায় ১০ জন নিহত হন। আহত হন অর্ধশতাধিক। পরে স্থানীয়রা তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে মারা যান আরো ১৬ জন। এ সময় আহত হয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন।
এ ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ফ্যাক্টরির মালিক শামিম তালুকদারসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার (এসপি) খন্দকার মঈনুল হক জানান, এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে এ পর্যন্ত ১২ জনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান এসপি।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী জানান, অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট মল্লিকা খাতুনকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাকে আজকের (শুক্রবার) মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে রয়েছেন। মর্মান্তিক এ ঘটনার সংবাদ পেয়ে টেলিফোনে তিনি নিহতদের জন্য সমবেদনা জানান এবং অনুদানের ঘোষণা দেন। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেনÑ শহরের পাটগুদাম বিহারি ক্যাম্পের সিরাজুলের ছেলে সিদ্দিক (১২), নূরু ইসলামের স্ত্রী সখিনা (৪০), তার মেয়ে লামিয়া (৫), মৃত বারেকের স্ত্রী সামু বেগম (৬০), মৃত জুমরাতির স্ত্রী হাজেরা খাতুন (৭০), মৃত্যুঞ্জয় স্কুল রোডের বসাক পট্টির গবিন্দ বসাকের স্ত্রী মেঘলা বসাক (৫৫), শহরের ধোপাখলা এলাকার নারায়ণ চন্দ্র সরকারের স্ত্রী সুধা রানী সরকার (৫৫), মৃত বজেন্দ্রর স্ত্রী রিনা (৬০), মৃত সুলতান মিয়ার স্ত্রী জামেনা বেওয়া (৬৫), চরপাড়া এলাকার হায়দার আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম (৪৫), আকুয়া দক্ষিণ পাড়ার জালালের স্ত্রী নাজমা বেগম (৫০), ফজলু মিয়ার স্ত্রী মোমতাজ বেগম (৪০), সালামের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৫৫), রবি হোসেনের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৫২), কাঠগোলা বাজারের আব্দুল মজিদের স্ত্রী রেজিয়া আক্তার (৫৫), রতন মিয়ার মেয়ে রুবী আক্তার (১২), কাচারীঘাট এলাকার মাহাতাব উদ্দিনের স্ত্রী ফজিলা বেগম (৭৫), দরগাপাড়ার রাজা মিয়ার স্ত্রী নাজমা আক্তার (৬০), থানাঘাট এলাকার আব্দুস সালেকের স্ত্রী খোদেজা বেগম (৫০), চর ঈশ্বরদিয়ার লাল মিয়ার স্ত্রী সুফিয়া বেগম (৬০), তারাকান্দা থানার বালিডাঙ্গা গ্রামের মোসলেম মিয়ার স্ত্রী মরিয়ম (৫০), কালিবাড়ি এলাকার শফিকুল ইসলামের স্ত্রী আঙ্গুরী বেগম (৩৫), ত্রিশালের বালিপাড়া গ্রামের আঞ্জু মিয়ার স্ত্রী সাহরন বেগম (৪০) ও জামালপুর জেলার হরিণাকান্দা গ্রামের আবুল হোসেনের কন্যা ইতি বেগম (১২)। ঘটনার পরপর পুলিশ সুপার খন্দকার মঈনুল হক ২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। পরে বেলা ২টায় তিনি জানান, নিহতের সংখ্যা ২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতাল মর্গ থেকে পুলিশ ১৬ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে প্রায় সবাই শিশু ও নারী। এদিকে জাকাত নিতে আসা হতদরিদ্র জয়নাল, খসরু ও রেবেকা বেগমসহ স্থানীয়দের অভিযোগ, ভিড় এড়াতে তাদের লাঠিপেটা করা হয়েছে। ফলে দিগি¦দিক ছুটোছুটি করে এতগুলো মানুষ লাশ হলো। তাদের দাবি, মৃতের সংখ্যা ৩০ জন হবে। আশপাশের অলিগলিতেও কয়েকটি লাশ রাস্তার উপর পড়ে থাকতে দেখেছেন তারা।
যাকাত বিতরণে দুর্ঘটনা : নিহতদের মধ্যে ২৬ জনের লাশ শনাক্ত
