উত্তরবঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা রংপুর

উত্তরবঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা রংপুর। এ জেলার বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। এবারের বেড়ানো উত্তরের জেলা রংপুরে।

তাজহাট জমিদার বাড়িকেরামতিয়া মসজিদ

পুরোনো মসজিদটি শহরের জজ কোটের পেছনে অবস্থিত। ইসলাম ধর্মের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর ৩৫তম বংশধর কেরামত আলী জৌনপুরী ইসলাম প্রচারের জন্য রংপুরে আসেন। তার মৃত্যুর পরে ১৮৭৩ সালে মাজার সংলগ্ন এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মোগল স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি আয়তকার। পুরোনো মসজিদটি সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে সামনে মসজিদটির সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

স্মারকস্তম্ভ ‘অর্জন’

শহরের মডার্ন মোড়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশেই স্মারকস্তম্ভ ‘অর্জন’। স্তম্ভটির সবচেয়ে উপরে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। সম্মুখ ও পশ্চাদভাগে সিরামিক ম্যুরালচিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামের বিস্তীর্ণ ইতিহাস। ‘৭১-এর ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর বীর বাঙালির বিজয় পর্যন্ত বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ ম্যুরালচিত্রে।

কারমাইকেল কলেজ

এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে গোপাল লাল রায় বাহাদুর, মহিমা রঞ্জন রায়, অন্নদা মোহন রায়, বাবু মণি চন্দ্র রায়, সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় প্রমুখ স্থানীয় জমিদারদের উদ্যোগে প্রায় ৯০০ বিঘা জমির উপর ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এ কলেজটি। বাংলার তত্কালীন গভর্নর লর্ড ব্যারোন কারমাইকেলের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় এবং তিনিই এর উদ্বোধন করেন। কারমাইকেল কলেজের ছায়াঘেরা ক্যাম্পাসটি ঘুরে দেখে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন এখানে।

তাজহাট জমিদার বাড়ি

রংপুর শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে তাজহাট গ্রামে অবস্থিত এ জমিদার বাড়িটি। রত্ন ব্যবসায়ী মান্নালাল ছিলেন তাজহাট জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা। ব্যবসায়িক কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি রংপুরের মাহিগঞ্জে এসে বসবাস শুরু করেন এবং একটি ভবন নির্মাণ করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে তার এ ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি আহত হয়ে পরবর্তীতে মারা যান। তার দত্তক পুত্র গোপাল লাল রায় বাহাদুর জমিদারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান ভবনটির নির্মাণ শুরু করেন। ১৯১৭ সালে ভবনটি সম্পূর্ণ হয়। ইটালী থেকে আমদানিকৃত শ্বেত পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এ বাড়ির সম্মুখের সিঁড়িটি। পুরো ভবনটিতে রয়েছে ২৮টি কক্ষ। ভবনের সামনে মার্বেল পাথরের সুদৃশ্য একটি ফোয়ারা আজও বিদ্যমান। ১৯৫২ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরে এ বাড়ি চলে যায় কৃষি বিভাগের অধীনে এবং এখানে গড়ে ওঠে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ বাড়ির প্রচুর মূল্যবান সম্পদ খোয়া যায়। ১৯৮৫ সালে এখানে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে তাজহাট জমিদার বাড়ি রূপান্তর করা হয় জাদুঘরে। আর এর নাম রংপুর জাদুঘর। এ জাদুঘরের তিনশটি মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে। রংপুর জাদুঘরের গ্রীষ্মকালীন সময়সূচি (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) হলো বেলা ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। মাঝে দুপুর একটা থেকে ত্রিশ মিনিট মধ্যাহ্ন বিরতি আছে। আর শীতকালীন (অক্টোবর-মার্চ) সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি। রবিবার পূর্ণ দিবস, সোমবার অর্ধ দিবসসহ সরকারি সব ছুটির দিনে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। এ জাদুঘরে বাংলাদেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রবেশ মূল্য যথাক্রমে ১০ ও ২০ টাকা।

পায়রাবন্দ

জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দে রয়েছে নারী জগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের বসতভিটা। ২০০১ সালে এখানে সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। একটি বেদির ওপরে এখানে স্থান পেয়েছে বেগম রোকেয়ার পূর্ণাবয়ব ব্রোঞ্জ নির্মিত প্রতিকৃতি।

ভিন্নজগত

রংপুর শহর থেকে প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার দূরে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক থেকে সামান্য ভেতরে গঞ্জীপুর গ্রামে অবস্থিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। দেশের প্রথম প্লানেটোরিয়ামটি এখানেই। এখানকার বিশাল প্রান্তরজুড়ে রয়েছে লেক, বাগান, শিশু পার্ক রিজর্টসহ আরও অনেক কিছু।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে রংপুর যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবহন হলো গ্রীন লাইন এবং টিআর ট্রাভেলস। এ দুই পরিবহনের এসি বাসের ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা। এ ছাড়া এ রুটে আগমনী পরিবহন, এস আর, শ্যামলী, হানিফ, কেয়া ইত্যাদি পরিবহনের সাধারণ বাস চলাচল করে। ভাড়া ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

রংপুর শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। এ শহরে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের একটি বড় ধরনের মোটেল রয়েছে। এখানে কক্ষভাড়া ১২০০-৩৫০০ টাকা। ফোন :০৫২১-৬৩৬৮১, ৬২৮৯৪। শহরের জেল রোডে বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস’র আবাসন ব্যবস্থা ভালো। ফোন ০৫২১-৬২৫৯৮, ৬২৮৬৩। এ ছাড়া জাহাজ কোম্পানির মোড়ে হোটেল শাহ আমানত, ফোন :০৫২১-৬৫৬৭৩।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *