গাজীপুরে দু’দিনের ব্যবধানে আবারো কেয়া গার্মেন্টস কারখানার দু’শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ্য : শ্রমিক বিক্ষোভ ও কারখানা ছুটি ঘোষণা

Gazipur-1-_12_September_2015-Garments_Worker_Illness_For_Drinking_Water-2

 

গাজীপুরের কোনাবাড়ি শিল্প এলাকায় দু’দিনের ব্যাবধানে কেয়া গ্রুপের কেয়া গার্মেন্টস কারখানার শতাধিক শ্রমিক শনিবার আবারো অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে।

মাত্র দু’দিনের ব্যাবধানে দ্বিতীয় দফায় আবারও শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় আতংকিত ও ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কাজ ফেলে কারখানা থেকে বেরিয়ে গিয়ে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকের মতে ‘গণ হিস্টোরিয়া’ রোগে শ্রমিকরা অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবী, ঈদের আগে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে কারখানা বন্ধ করে দিতে ও কর্তৃপক্ষকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে একটি চক্র শ্রমিকদের ব্যবহার করে এ ঘটনা ঘটাচ্ছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের ইন্সপেক্টর রোকনুজ্জামান ও জয়দেবপুর থানার কোনাবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মোবারক হোসেন জানান, গাজীপুরের কোনাবাড়ি শিল্প এলাকার জরুনস্থিত কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাণ কেয়া নীট কম্পোজিট এর কেয়া গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকরা শনিবার সকালে কাজে যোগ দেয়। ওই পোশাক কারখানার উৎপাদন শুরু হওয়ার পর সকাল ১০টার দিকে সুয়িং সেকশনের কিছু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর কিছু সময় পর হতে অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে। একে একে শ্রমিকদের মুখ দিয়ে লালা বের হওয়া, বমি বমিভাব, মাথা ঘোরানো ও পেট ব্যাথা শুরু হয়। এতে অন্ততঃ দু’শ শ্রমিক পর্যায়ক্রমে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। অসুস্থ্যদের অনেকের খিচুনীও দেখা দেয় এবং অচেতন হয়ে পড়ে। কারখানা কর্তৃপক্ষ ও তাদের লোকজন অসুস্থদের উদ্ধার করে স্থানীয় শরীফ জেনারেল হসপিটাল, কোনাবাড়ি ক্লিনিক, পপুলার হাসপাতাল, কোনাবাড়ি ডিজিটাল আধূনিক হাসপাতাল ও হক জেনারেল হসপিটালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। অসুস্থ্যদের মধ্যে প্রায় সবাই ওই পোশাক কারখানার সুয়িং সেকশনের নারী শ্রমিক। দু’দিনের ব্যাবধানে দ্বিতীয় দফায় শনিবার আবারও শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনার জেরে শ্রমিকদের মাঝে আতংক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এঘটনায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কাজ ফেলে কারখানা থেকে বেরিয়ে যায় এবং বিক্ষোভ করতে থাকে। একপর্যায়ে বিক্ষব্ধ শ্রমিকরা পার্শ্ববর্তী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার কেয়া গার্মেন্টস কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

এর আগে গত বুধবার কারখানার ক্যান্টিনসহ সরবরাহ লাইন থেকে পানি পান করে অন্ততঃ দুই’শ শ্রমিক পর্যায়ক্রমে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। কারখানার পানির নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার সংশ্লিষ্ট ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ওইদিনের ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিক্ষোভ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বুধবারের জন্য কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বুধবার কারখানার পানি খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঘটনার প্রেক্ষিতে ছুটি ঘোষণার পর শনিবার কেয়া গার্মেন্টস কারখানা চালু হয়। এদিন কারখানার সরবরাহ লাইন থেকে শ্রমিকদের পানি সরবরাহ করা হয়নি। বুধবারের ঘটনার পর থেকে অনেকেই যার যার মতো মিনারেল ওয়াটার বা বিশুদ্ধ পানি এনে শ্রমিকরা পান  করছে। এ ছাড়াও কারখানার পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ‘মাম’ পানি সরবরাহ করা হয়েছিল।

কেয়া গার্মেন্টস কারখানার একাধিক শ্রমিক জানায়, সকালে কারখানার কাজে যোগ দেন তারা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকদের অনেকেই কারখানার একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এভাবে  শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের বমি বমি ভাব, মুখে লালা ঝরা, পেট ব্যাথা ও মাথা ঘুরিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে থাকেন। অনেকের খিচুনীও দেখা দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সহযোগিতা কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।

কোনাবাড়ি শরীফ জেনারেল হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা: খান মোহাম্মদ শরীফ জানান, সকাল ১০টা থেকে অসুস্থ্য শ্রমিকরা পর্যায়ক্রমে হাসপাতালে আসতে থাকে। শ্রমিকরা ‘গণ হিস্টোরিয়া’ রোগে আক্রান্ত ছিল। ডাক্তারি ভাষায় এটাকে ‘হিস্টোরিক কনভালসিভ রিয়েকশন বলে। এটা একটা মানসিক রোগ। এতে একজনের দেখাদেখি অন্যজন আক্রান্ত হয়ে থাকে।  তিনি আরো জানান, তার হাসপাতালে ৭০/৮০ জন চিকিৎসা দিয়েছেন।

কারখানার জিএম আরএ সোহেল জানান, শনিবার সকাল ৮টার দিকে অন্যদিনের মতো একতলা কারখানার শেডের সুয়িং ফ্লোরে প্রায় চার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দেন। এর প্রায় দেড় ঘন্টা পর গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। কারো মুখে লালা ঝরতে ও অচেতন হয়ে পড়তে দেখে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় কোনাবাড়ি শরীফ জেনারেল হাসপাতাল, কোনাবাড়ি ক্লিনিক, হক জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠানো হয়। গত বুধবারে কারখানার সরবরাহ লাইনের পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে সেখান থেকে শনিবার তাদের পানি সরবরাহ করা হয়নি। বুধবারের পর থেকে অনেকেই যার যার মতো মিনারেল ওয়াটার বা বিশুদ্ধ পানি এনে তারা পান  করছেন। কিন্তু হঠাৎ দ্বিতীয় দফায় কেন আবার একই অবস্থার সৃষ্টি হলো বুঝতে পারছি না।

কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক পাঠান জানান, ঈদের আগে কর্তৃপক্ষকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে একটি চক্র শ্রমিকদের ব্যবহার করছে। শ্রমিকরা সকালে কার্ড পাঞ্চ করে ভেতরে ঢুকে। পরে অসুস্থ না হলেও ১০-১২জন করে শ্রমিক অসুস্থতার ভান করে এবং অন্য শ্রমিকরা কারখানা ছুটির ও বন্ধ করে দেয়ার জন্য তৎপরতা চালায়। তবে এ ঘটনার পূনরাবৃত্তি হতে থাকলে কারখানা লে-অফ ঘোষণা করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *